আন্তর্জাতিক ডেস্ক ।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এখন এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সরাসরি সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উত্তেজনার কেন্দ্রে থাকা হরমুজ প্রণালি কার্যত এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও পণ্য পরিবহন খরচ আকাশচুম্বী।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। লয়েডস লিস্টের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরীয় এলাকায় জাহাজ চলাচল আশঙ্কাজনকভাবে ৯৫ শতাংশ কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে দৈনিক ১২০টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত, সেখানে এখন হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজের উপস্থিতি এই পথের স্থবিরতাকেই স্পষ্ট করে। কেপলারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে চলাচলকারী মাত্র ১৫৫টি জাহাজের সিংহভাগই জ্বালানি ট্যাংকার, যা বিশ্বজুড়ে সরবরাহ সংকটের গভীরতাকে ফুটিয়ে তুলছে।
এমন সংকটময় মুহূর্তে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির একটি ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েলের জন্য এই পথ রুদ্ধ করার হুঁশিয়ারি দিলেও, বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর জন্য ইরান সেফ প্যাসে’ বা নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দিয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশ, ভারত, চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানিয়েছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এই বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর জাহাজের জন্য পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। তবে শত্রুভাবাপন্ন দেশ বা ট্রানজিট অনুমতিহীন কোনো জাহাজকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হচ্ছে না— যার প্রমাণ সম্প্রতি মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে দেওয়া পাকিস্তানগামী একটি কনটেইনার জাহাজ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই সিলেক্টিভ বা বাছাইকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নীতি মূলত একটি কৌশলগত কূটনৈতিক চাল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখা, অন্যদিকে এশিয়ায় নিজেদের বলয় শক্তিশালী করা। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য এই অভয়বাণী স্বস্তির হলেও, সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার এই সংকট কতদিন স্থায়ী হয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়। আকাশচুম্বী পরিবহন ব্যয়ের চাপে পিষ্ট সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে বিশ্বের অনেক দেশই এখন জরুরি সহায়তা বা বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবছে।