নেত্রকোনার দুর্গাপুরে এক দশক আগে নিজ শোবার ঘরে ব্যবসায়ী অরুণ কুমার সাহা ও তার স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। ঘটনার ১০ বছর ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও খুনিদের শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দীর্ঘ এই সময়ে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে অন্তত ৯ বার। সর্বশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করায় আলোচিত এই জোড়া খুনের বিচার পাওয়ার আশা ফিকে হয়ে গেছে স্বজনদের।
২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর দিনে দুর্গাপুর পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত অরুণ কুমার সাহা (৭৪) স্থানীয় ‘সুবর্ণা প্লাজা’ মার্কেটের মালিক ছিলেন। ওই ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে স্ত্রী হেনা রানী সাহাকে (৬৫) নিয়ে তিনি থাকতেন। তাদের চার সন্তানের মধ্যে তিনজনই বিদেশে থাকেন। বড় ছেলে সুজিত কুমার সাহা মা-বাবার সঙ্গেই থাকতেন, তবে ঘটনার আগের দিন তিনি ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় যান।
হত্যাকাণ্ডের দিন সকাল থেকে সুজিত তার মা-বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। দুপুরে প্রতিবেশীদের মাধ্যমে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, ফ্ল্যাটের দরজা খোলা এবং পৃথক দুটি কক্ষে অরুণ ও হেনার রক্তাক্ত মরদেহ মেঝেতে পড়ে আছে। পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করলেও ঘর থেকে কোনো মূল্যবান সম্পদ খোয়া না যাওয়ায় একে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে ধারণা করা হয়েছিল।
মামলাটি প্রথমে থানা পুলিশ ও পরে জেলা গোয়েন্দা শাখা তদন্ত করে। এরপর দীর্ঘ সময় সিআইডি এবং সবশেষে পিবিআইয়ের হাতে ন্যস্ত হয়। ৯ জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও হত্যাকাণ্ডের কোনো কূলকিনারা হয়নি। পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ ও প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় শেষ পর্যন্ত মামলার তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। ফলে এক সময়ের আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা ছিল এবং কেন এই প্রবীণ দম্পতিকে প্রাণ দিতে হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর অধরাই রয়ে গেল।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় পার হওয়ায় এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণের অভাবে রহস্যভেদ করা সম্ভব হয়নি। এদিকে বিচার না পাওয়ায় নিহতের পরিবারের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
ঘটনার তিন দিন পর সুজিত কুমার সাহা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় হত্যা মামলা করেন। কিন্তু থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রেজাউল ইসলাম খান খুনের ঘটনাস্থল সংরক্ষণ, আলামত সংগ্রহ করেননি বলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান।
পুলিশ সূত্র জানায়, মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দুর্গাপুর থানা-পুলিশের কাছ থেকে ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দেওয়া হয়। সিআইডি তদন্ত নেওয়ার পর তিনবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। সিআইডির সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা নেত্রকোনা সিআইডিতে দায়িত্বে থাকা তখনকার জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার শংকর কুমার দাস ২০১৭ সালের শেষ দিকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন।
শংকর কুমার দাস প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘এই জোড়া খুনের তদন্তভার এক বছর চলে যাওয়ার পর আমাকে দেওয়া হয়েছিল। অনেক দিন চলে যাওয়ায় খুনের আলামত নষ্ট হয়ে যায়। কিছুই সংরক্ষিত হয়নি। সন্দেহে থাকা কয়েকজনের ব্যবহৃত মুঠোফোনের কল রেকর্ডও পাওয়া যায়নি।
মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য পরবর্তী সময়ে বাদী নারাজি আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিবিআইকে দায়িত্ব দেন। এরপর পিবিআইয়ের পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। সর্বশেষ পরিদর্শক অভি রঞ্জন দেব তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে দুর্গাপুর চৌকি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভি রঞ্জন দেব প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘ক্রাইম সিনসহ প্রয়োজনীয় আলামত তখন সংরক্ষণ না করায় মামলাটি নিয়ে খুবই বেগ পেতে হয়। কোনো কিছু না পেয়ে শেষে আদালতে চার্জশিটি দাখিল করা হয়।
এ বিষয়ে বাদী সুজিত কুমার সাহা বলেন, ‘পুলিশ দীর্ঘদিন তদন্ত করে রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পারায় এখন হতাশ হচ্ছি। আমি চাই আমার মা–বাবার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হোক।
পিবিআই নেত্রকোনায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মো. রফিকুল আক্তার বলেন, ‘রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।



